রক্তদান করার পর দেহে পুনরায় ওই রক্ত তৈরি হতে কতদিন সময় লাগে?

 


রক্তদান: জীবনের উপহার ও এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো

রক্তদান হলো মানবতার সেবার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই মহৎ কাজ শুধু প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ করে না বরং রক্তদাতার শরীরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত রক্তদান করলে শরীরে রক্তকণিকার সঠিক উৎপাদন বজায় থাকে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা প্রতিরোধ করা যায়। এখানে রক্তদানের কিছু বিশেষ উপকারিতা এবং নিয়ম তুলে ধরা হলো:

রক্তদানের উপকারিতা

১. নতুন রক্তকণিকা উৎপাদন: রক্তদান করার পর শরীরের বোন ম্যারো নতুন রক্তকণিকা তৈরিতে উদ্দীপ্ত হয়। রক্তদানের প্রায় ২ সপ্তাহের মধ্যেই শরীরে নতুন রক্তকণিকার ঘাটতি পূরণ হয়। বছরে তিনবার রক্তদান করলে রক্তের লোহিত কণিকাগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

২. হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়: নিয়মিত রক্তদান হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। এতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদপিণ্ড সুস্থ থাকে।

৩. স্বাস্থ্য পরীক্ষা: রক্তদান করলে বিনা খরচে কিছু সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এতে জানা যায় দাতার শরীরে হেপাটাইটিস, এইচআইভি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া বা অন্য কোনো গুরুতর সংক্রমণ আছে কিনা।

৪. ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক: গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রক্তদান জটিল ও দুরারোগ্য রোগ থেকে মুক্ত রাখতে সহায়ক, যা ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমাতে পারে।

৫. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত রক্তদান শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়ক, যা ওজন কমানো ও হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর।

৬. মানসিক তৃপ্তি: মুমূর্ষু রোগীকে রক্তদান করে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। এটি একটি মহান কাজ যা আত্মতৃপ্তি এনে দেয়।

৭. ধর্মীয় পুণ্যের কাজ: রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা মানবতার এক মহৎ দান।

৮. অর্থ সাশ্রয়: রক্তদান কেন্দ্রে রক্ত দিলে সাধারণত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হয়, যা বাইরে করলে বেশ খরচ হবে।

৯. Hemochromatosis প্রতিরোধ: নিয়মিত রক্তদান Hemochromatosis, অর্থাৎ শরীরে অতিরিক্ত আয়রনের উপস্থিতি প্রতিরোধে সহায়ক।

১০. ওজন কমাতে সহায়ক: স্থূল দেহী মানুষের জন্য রক্তদান একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি যা ওজন কমাতে সাহায্য করে।

রক্তদানের সাধারণ প্রশ্নাবলী ও উত্তর

রক্তদানের যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলী

১. বয়স: ১৮ বছরের বেশি হলে রক্তদান করা যায়।

২. নিরাপত্তা: রক্তদান সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

৩. পরিমাণ: প্রতি রক্তদানে প্রায় ৩৮০-৪০০ মিলিলিটার রক্ত নেওয়া হয়।

৪. সময়: প্রতি তিন মাস পর পর রক্তদান করা যায়।

৫. ব্যথা: রক্তদানে সামান্য ব্যথা লাগলেও এটি খুবই সহনীয়।

৬. অজ্ঞান হওয়ার সম্ভাবনা: রক্তদান নিরাপদ, তবে বিশ্রাম নেওয়া উচিত।

৭. ওজন: রক্তদাতার ওজন ৪৭ কেজির বেশি হওয়া উচিত।

৮. বিশেষ খাদ্যাভ্যাস: রক্তদানের পর পর্যাপ্ত তরল পান করতে হবে এবং ভারী কাজ এড়াতে হবে।

বিশেষ কিছু শর্ত

১. ব্লাড প্রেশার: নিয়ন্ত্রিত ব্লাড প্রেশার থাকলে রক্তদান করা যেতে পারে।

২. সর্দি-জ্বর: সংক্রমণ থাকলে রক্তদান করবেন না।

৩. এন্টিবায়োটিক ওষুধ: এন্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করার ৭ দিন পর রক্তদান করতে পারেন।

৪. ভ্যাকসিন নেওয়ার পর: ভ্যাকসিন নেওয়ার ৪ সপ্তাহ পর রক্তদান করতে পারেন।

৫. ডায়াবেটিস: যারা ইনসুলিন নেন তাদের রক্তদান না করাই ভালো।

রক্তদানের পর করণীয়

রক্তদানের পর পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া উচিত। ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করুন এবং ধূমপান এড়িয়ে চলুন।

রক্তদান করা শুধু একজন মানুষের জীবন রক্ষা করে না, বরং আমাদের নিজেদের শরীরকেও স্বাস্থ্যকর রাখে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url